-তাহলে খারাপ থাকার কথা বলছিস কেন? চাকরি কেমন চলছে?
-সে জন্যেই বললাম। চাকরিটা, জানোই তো ছোট, অল্প বেতন। আইএইচ কোম্পানীতে একটা ওপেনিং
আছে, তোমাকে বলব ভাবছিলাম। যদি একটু দেখ।
হক, হাকিম সাহেব একই ক্লাসে পড়তেন ইয়্যুনুভার্সিটিতে।
হাকিম বললেন-কি পোস্ট?
-অ্যাকাউন্টেন্ট।
-কবে নেবে?
-গতকালই ইন্টারভিউ হয়েছে।
-ও, তাহলে তো হাতে সময় বেশি নেই।
-হ্যাঁ, তুমি একটু তাকে বললেই হয়ে যাবে।
-আচ্ছা বলব। বাদলের চাকরিটা হয়েছে?
বাদল ওদের মামাতো ভাই, ছোটটা। এপিআইতে চাকরির জন্য হাকিম সাহেবই তদবির করেছিলেন। তিনি
অনেক মানুষকে চেনেন, অনেক প্রতিষ্ঠিত এবং সাধারণ মানুষকে। এবং সবাই তাকে সৎ মানুষ হিসেবে
অত্যন্ত শ্রদ্ধা করে। তদবিরের জন্য তাই তাদের আত্মীয় থেকে শুরু করে সামান্য পরিচিতও
অনেকে আসে তার কাছে। তিনি wbt¯^v_©fv‡e তাদের
সাহায্য করেন।
মোর্শেদ বলে-হ্যাঁ। হয়েছে ভাইয়া।
-বাহ্। ভালো। বেতন কত?
-বার হাজার।
-এখন তো বোধহয় প্রবেশন পিরিয়ড।
-হ্যাঁ। দু মাস পরে পারমানেন্ট হলে এক লাফে আঠারো বিশ হাজার হয়ে যাবে। খুব ভালো, ওরা খুব খুশি।
-চাকরিটা ওকে মন দিয়ে করতে বল্।
-বলব ভাইয়া।... পরশু সাহেদ ভাইয়ার বাসায় গিয়েছিলাম। তিনি কথা বলতে পারেন না এখন।
শাহেদ তাদের আরেক কাজিন। পক্ষাঘাতে ওর একপাশ অবশ হয়ে গেছে।
হাকিম সাহেব বললেন-খুব ভালো ছেলে। ও ছোট বেলায় খুব গাধা টাইপের
ছিল, নাক দিয়ে সব সময় সর্দি পড়তো, এ নিয়ে আমরা কত ক্ষেপাতাম। আর সে রেগে মেগে, সে এক অবস্থা আরকি। ওর হঠাৎ একি হল। আমার জ্বর ভালো হলে দেখতে যাব।
-সিঙ্গাপুর নিয়ে যাচ্ছে আবার, শুনলাম।
-আমাদেরও সময় হয়ে আসছে মনে হয়। ভয় লাগে। তানুর কী হবে যদি কিছু হয়ে যায়? সে আমার শেষ বয়েসের সন্তান। মাঝে
মাঝে মনে হয় বিয়ের পরপর হলে কত ভালো হতো।
মোরশেদ কিছু বলল না কথার পিঠে।
তানজিলা ঝড়ের মতো উদয় হল সে ঘরে একটু বাদেই, ছোট চাচা খেয়ে যাবে দুপুরে?
-রান্না কে করবে? তুই নাকি?
-হ্যাঁ।
-আমার পুরো ভবিষ্যৎ সামনে পড়ে আছে। এখনই মরার কোনো ইচ্ছা নাই।
-আহা, তুমি তিনবেলা কী খাও আমার জানা আছে। তাড়াতাড়ি বল, আমি রান্না সেরে পড়তে যাব। কোচিং আছে।
-আচ্ছা, বলছিস যখন দে দেখি কী রাধিস।
***
মিঠু
স্যারের বাসাটা কাছেই, শাহজাহানপুর। বাসাবো রেল ক্রসিং-এ অনেক জ্যাম। এই টুকু
রাস্তা পেরুতেই পঁয়তাল্লিশ মিনিটের মতো লাগল।
মিঠু স্যার বেশ বেঁটে, পাঁচ ফুট হবেন সব মিলিয়ে। সব সময় পান চাবাচ্ছেন বলে তার
ঠোঁট অর্ধেক লাল, অর্ধেক গরুর কলিজার রঙের। ঠোঁটের পাশ গড়িয়ে প্রায়ই পানের রস পড়ে। তার তিনটা
বেত এক সাথে বাঁধা একটা ডান্ডা আছে, সেটা মাঝে মাঝে কেবল টেবিলের ওপর আছড়ে পড়ে, এটাই তার ধমক। খুব বিরক্ত হলে তিনি এই কাজটি করেন। না হলে তার মতো মাই ডিয়ার শিক্ষক
কম আছে।
আজ প্রথমেই বললেন-বাড়ির কাজ কে কে আনে নাই?
কেউ হাত তুললো না।
-আহ্। সূর্য মনে হয় আজকাল পশ্চিমে উঠছে, নাকি?
-জ্বি স্যার। তানজিলা বলল।
-আমি কৃতার্থ বোধ করতেছি।
-তাহলে মিষ্টি আনান স্যার। তানজিলা ফটাফট বলে।
-শোন্, এক স্থানে দুইজন রসিক থাকলে বেপারটা বেরসিক হয়ে যায়। রসিকতা যা করার আমিই করতেছি।
-জ্বি আচ্ছা স্যার।
-বাবা সঞ্জু।
ব্যাচের সবচেয়ে বোকা ছাত্রটি বলল-জ্বি স্যার?
-সব অংক মিলেছে?
-না স্যার।
-কয়টা মিলেছে?
-একটাও না।
-কষ্ট করে হোমওয়ার্কের খাতাটা আনার কি দরকার ছিল? পরক্ষণেই তার গলা এক ধাপ উঠে
গেল-শোনো বাবা মা-রা আর মাত্র কয়েক মাস আছে। প্রি-টেস্ট, টেস্ট পরীক্ষা তারপর কেয়ামত। জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। এখন তোমরা
যতো খাটবা, ভবিষ্যৎ ততো উজ্জ্বল হবে। এবং আরো একটা লাভ হবে, সেটা হল এই দশ পনেরো ঘণ্টার
খাটুনিটা তোমাদের সারাজীবনের পুঁজি হয়ে যাবে। এইটা তোমাদের অ্যাসেট হয়ে থাকবে, বাবারা বুঝছ কি বলতেছি?
সবাই mg¯^‡i বলল-জ্বি স্যার।
-তিনা আসে নাই আজকেও?
-না স্যার।
-এই মেয়েটা-তিনি এরপর বিড়বিড় করে কিছু একটা বললেন তা কেউ শুসতে পেল না।
সাত
সে কিছু
কিছু জিনিস টের পায়। আর কিছু কিছু ব্যাপার যখন তখন ওর মনে আর মাথায় উঁকি দিতে
চায়, মাঝে মাঝে দিয়েও যায় কিন্তু তা খুব অস্পষ্ট মনে হয়! কী যেন একটা তার ছিল, এখন নেই। সেটা যে কী-তা আর স্মরণে আসে না। তার মাথায় হঠাৎ হঠাৎ যন্ত্রণা হয়, তীব্র সেই ব্যথা, সে আছড়ে পড়ে মাটিতে গোঙাতে থাকে, মুখে ফেনা ভাঙ্গে। অন্য পথের মানুষেরা কেবল একবার
দেখেই মুখ ফিরিয়ে নেয় তখন। চলে যায়। কাছে আসে না কেউ।
যা সে টের পায় সেগুলো মোটা দাগে বাধা। যেমন- ক্ষিধে, ঠাণ্ডা, গরম, ব্যথা আর ব্যথা না থাকা। তার স্মৃতি খুব দুর্বল তাই তার মনে নেই সে যখন এই শহরে এসেছিল
তখন গরমকাল ছিল। ঠাণ্ডা ঋতু এসে এর মধ্যে চলেও গেছে। এখন আবার গরম।
আরেকটি জিনিস সে অনুভব করতে পারে, যদিও এর নাম জানে না। সে যখন
গান গায় তখন অনুভব করে তা। আনন্দ।
¯^vfvweK প্রতিক্রিয়ার মতো তার গান আসে। আর গানের
মতো কথা। যদিও চুপ করেই কাটে তার সিংহভাগ সময়। কিন্তু মাঝে মাঝে সে গাইতে আরম্ভ
করে। জগতের আর যা কিছু তার মনে আছে সব ভুলে।
আজ তার ঘুম ভেঙ্গেছে কড়া রোদের আঁচে। সে ফুটপাথে শুয়ে ছিল, ওখানে অনেকগুলো রিকশা দাঁড়িয়ে থাকে সকাল সাতটা থেকে। তা ওরা দাঁড়িয়ে থাকলেও ওর ঘুমে
তেমন সমস্যা হয়নি। যদিও ঘুমের ভিতর সে হাত নেড়ে কানের পাশ থেকে শব্দ সরাবার
চেষ্টা করেছিল কয়েকবার। নিজের অজ্ঞাতে। তবু, এটা এই অসুবিধাটা সামান্য, ধরার মতো না।
সে একজন দয়ালু মানুষের মুখ খুঁজছে। দু’দিন হল। একটি মানুষ, তাকে অমৃতের মতো খাদ্য দিয়েছিল মমতা ভরে। কিন্তু
ওটা সব ভালো জিনিসের মতো শুধু একবারই ঘটেছে, মুখটাও সে মাত্র দু’দিনেই প্রায় ভুলে গেছে, শুধু অস্পষ্টভাবে মনে আছে দাড়িঅলা এক মুখ। এই পর্যন্ত।
খোঁজার
বোধটা শুধু রয়ে গেছে ওর কাজে কর্মে।
লাল কুকুরটা অনেক্ষণ ওকে শুকেছে। শুঁকে টুকে এখন পাশে গিয়ে শুয়ে পড়েছে।
সে চোখ
খুলে কিছুক্ষণ সূর্যটাকে একদৃষ্টিতে দেখার চেষ্টা করে। পারে না, সেকেণ্ডের মধ্যেই আপনা আপনি ওর চোখের পাতা বন্ধ হয়ে যায়। সে দু’আঙ্গুলে জোর করে পাতা খুলে রাখার চেষ্টা করে একসময়। কোনো
কাজ হচ্ছে না। চোখের পাতা কিছুতেই খোলা থাকবে না যেন পণ করেছে। সেও খেলার মতো করে চেষ্টা করে
যাচ্ছে। অনেকক্ষণ পর সে একসময় ক্ষান্ত দিল চোখের পাতাকে। এদিক ওদিক তাকাল, ফুটপাথে বেশ লোকজন আসছে যাচ্ছে। এক ইয়া মোটা মহিলা হাতে থলে নিয়ে তাকে পার হচ্ছিলেন, সে হঠাৎ ঐ মহিলার পিছনে হাঁটতে আরম্ভ করলো উঠে দাঁড়িয়ে। একইরকমভাবে কোমর লাড়িয়ে, ব্যাগটা ধরা হাতের মতো নিজের হাত আগুপিছু করতে করতে। কয়েকজন পথচারি হেসে উঠল এই দৃশ্য
দেখে। কিন্তু বেশিদূর তা করা গেল না। কারণ সব মেয়েদের মতো এই মহিলারও মাথার পেছনে একটা অতিরিক্ত
চোখ আছে। তিনি টের পেয়ে পিছু ফিরলেন। তার কটমটে চোখের সামনে পাগলটা প্রায় সাথে সাথেই রণে ভঙ্গ
দিল।
কুকুরটা তার থাবার ভিতর কাল রাতে বাজার থেকে আনা হাড্ডি একটা চাটছে, তার এক চোখ পাগলটার ওপর। লোকটা এদিকে আবার ফিরে আসছে দেখে সে একটু সতর্ক হয়। কিন্তু
ও কুকুরটাকে ফেলে এগিয়ে গেল।
পেটে কিছু দেয়া দরকার, ক্ষিদেয় জ্বলছে। যে মানুষটা অন্য জগতে থাকে, বেশিরভাগ জিনিসেরই নাম বা মর্ম জানে না, সেও খাবার দেখলে কিভাবে বুঝে ফেলে যে তা
ওর ক্ষুধার নিবৃত্তি ঘটাবে এ এক আশ্চর্য। সে লাঠিটা ঘোরাতে ঘোরাতে কিছু
দূর হেঁটেই কলাকে খাদ্য বলে শনাক্ত করতে পারল এবং দোকানি তেড়ে আসার আগেই তিন চারটা
কলা তার হাতে চলে এল। সে দৌড় দিয়েছে। এই কাজটা সে খুব ভালো পারে।
এই এলাকাটা
বেশ ভালোই। তার খুব পছন্দ হচ্ছে। কিন্তু সুখ
বেশিক্ষণ কারো সহ্য হয় না, তার ক্ষেত্রেও
এর ব্যতিক্রম হল না।